Thursday, July 9, 2026
ইসলামে জাতিভেদের কোনো স্থান নেই — তথাকথিত জাতিভেদ দূরীকরণে চাই আলোচনা সভা, সেমিনার ও ওয়াজ মাহফিলমানবসভ্যতার ইতিহাসে বিভাজনের যত রেখা টানা হয়েছে, তার মধ্যে সবচেয়ে ক্ষতিকর রেখাগুলোর একটি হলো জন্ম, বংশ বা পরিচয়ের ভিত্তিতে মানুষের মর্যাদা নির্ধারণের প্রবণতা। অথচ ইসলাম এমন এক মহান জীবনব্যবস্থা, যার সূচনালগ্নেই ঘোষণা করা হয়েছে—সমস্ত মানুষ একই পিতা-মাতা, হযরত আদম (আ.) ও হযরত হাওয়া (আ.)-এর সন্তান। তাই ইসলামে মানুষের পরিচয় তার বংশ, গোত্র বা উপাধিতে নয়; বরং তার ঈমান, তাকওয়া, চরিত্র এবং সৎকর্মে।পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ঘোষণা করেছেন—"নিশ্চয়ই আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তিই সর্বাধিক সম্মানিত, যে সর্বাধিক পরহেজগার।" (সূরা আল-হুজুরাত: ১৩)এই একটি আয়াতই ইসলামে তথাকথিত জাতিভেদ, বংশগৌরব ও সামাজিক অহংকারের ভিত্তিকে ভেঙে দেয়। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে আরও স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছিলেন—«কোনো আরবের ওপর অনারবের, কোনো অনারবের ওপর আরবের, কোনো শ্বেতাঙ্গের ওপর কৃষ্ণাঙ্গের কিংবা কোনো কৃষ্ণাঙ্গের ওপর শ্বেতাঙ্গের কোনো শ্রেষ্ঠত্ব নেই; শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র মাপকাঠি হলো তাকওয়া।»এই ঘোষণাই ইসলামের সাম্য, মানবতা ও ভ্রাতৃত্বের চিরন্তন সনদ।তবুও দুঃখজনক হলেও সত্য, বরাক উপত্যকার মুসলিম সমাজে আজও এক ধরনের তথাকথিত জাতিভেদের মানসিকতা কোথাও কোথাও বিদ্যমান। কেউ একে প্রকাশ্যে স্বীকার করুন বা না করুন, বাস্তবতার নিরিখে এর অস্তিত্ব পুরোপুরি অস্বীকার করা কঠিন। কোথাও বংশের অহংকার, কোথাও উপাধির গর্ব, কোথাও আবার তথাকথিত নিচু পরিচয়ের কারণে অবহেলা—এসব আচরণ ইসলামের শিক্ষা নয়; বরং সামাজিক কুসংস্কার ও ঐতিহাসিক অভ্যাসের বহিঃপ্রকাশ।বর্তমান সময়ে এই বিষয়টিকে কেন্দ্র করে পারস্পরিক বিদ্বেষ, সামাজিক বিভাজন কিংবা "Divide and Rule" ধরনের রাজনীতির আশ্রয় নেওয়া আরও বিপজ্জনক। কারণ আজকের ভারতবর্ষ বহু গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক, সামাজিক ও গণতান্ত্রিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। এমন সময়ে বিভক্তির রাজনীতি নয়, প্রয়োজন ঐক্যের রাজনীতি।প্রকৃতিও আমাদের এই শিক্ষা দেয়। বন্যার সময় ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পিঁপড়েগুলো পর্যন্ত একে অপরকে আঁকড়ে ধরে জীবন রক্ষার চেষ্টা করে। অথচ মানুষ, যে সৃষ্টির সেরা জীব, সে যদি ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পরিচয়ের অহংকারে বিভক্ত হয়ে পড়ে, তবে তা কেবল দুর্বলতাই ডেকে আনে।আজ যখন দেশজুড়ে বিভিন্ন ধর্ম, ভাষা, জাতি ও বর্ণের মানুষ গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার এবং সংবিধানের মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ হওয়ার প্রয়াস চালাচ্ছেন, তখন মুসলিম সমাজের ভেতরে তথাকথিত আশরাফ-আতরাফ কিংবা জাতভিত্তিক বিতর্ক উসকে দেওয়া সময়োপযোগীও নয়, কল্যাণকরও নয়।বাস্তবতা হলো, বরাক উপত্যকার মুসলিম সমাজে প্রচলিত অধিকাংশ টাইটেল বা উপাধিই মূলত ঐতিহাসিকভাবে পেশাভিত্তিক। এগুলো জন্মগত কোনো ধর্মীয় মর্যাদা নয়। সমাজ ও রাষ্ট্রের নির্দিষ্ট সময়ে কোনো ব্যক্তি তাঁর কর্ম, দায়িত্ব বা পেশার কারণে একটি উপাধি অর্জন করেছিলেন। পরবর্তীকালে তা পারিবারিক পরিচয় হিসেবে ব্যবহৃত হতে থাকে।একটি সাধারণ উদাহরণ ধরা যেতে পারে। একজন ব্যক্তি একটি তালুকের মালিক ছিলেন, তাই তিনি "তালুকদার" নামে পরিচিত হলেন। তাঁর মৃত্যুর পর যদি চারজন উত্তরাধিকারী সম্পত্তি সমানভাবে ভাগ করে নেন, তবে প্রত্যেকেই আর পূর্ণ তালুকের মালিক থাকেন না। কিন্তু উপাধিটি থেকে যায়। অর্থাৎ উপাধি সবসময় বর্তমান বাস্তবতা বা ব্যক্তিগত যোগ্যতার পরিচয় বহন করে না; বরং অনেক ক্ষেত্রে তা কেবল ঐতিহাসিক স্মৃতি হিসেবে টিকে থাকে।একইভাবে, কেউ যদি নিজেকে "মাইমাল" বা "মৎস্যজীবী" পরিচয়ে পরিচিত করেন, অথচ তিনি বা তাঁর পরিবার বহু প্রজন্ম ধরে মাছ ধরা বা মাছের ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত না থাকেন, তাহলে সেই পরিচয়ও বাস্তব পেশাগত পরিচয় নয়; বরং একটি ঐতিহাসিক সামাজিক পরিচয়মাত্র। ফলে এসব পরিচয়কে শ্রেষ্ঠত্ব কিংবা হীনমন্যতার মানদণ্ডে পরিণত করা যুক্তিসংগত নয়।এ কথা স্বীকার করতেই হবে যে অতীতে আমরা অনেকেই আবেগের বশে বা সামাজিক বাস্তবতার প্রভাবে এসব বিতর্কে জড়িয়ে পড়েছি। কিন্তু সময়ের দাবি হলো—বিতর্ক নয়, সমাধান; বিভাজন নয়, সম্প্রীতি; বিদ্বেষ নয়, ভ্রাতৃত্ব।তাই আজ সবচেয়ে জরুরি হলো সমাজজুড়ে ইতিবাচক সচেতনতা সৃষ্টি করা। প্রতিটি মসজিদ, প্রতিটি মহল্লা, প্রতিটি ওয়াজ মাহফিল, প্রতিটি ইসলামিক সম্মেলন এবং প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে ইসলামের সাম্যের শিক্ষা তুলে ধরা দরকার। ইসলামি চিন্তাবিদ, আলেম-উলামা, গবেষক, শিক্ষক এবং সমাজবিজ্ঞানীদের অংশগ্রহণে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা সভা, সেমিনার, সিম্পোজিয়াম ও উন্মুক্ত সংলাপের আয়োজন সময়ের অপরিহার্য দাবি।এসব আয়োজনের উদ্দেশ্য কোনো সম্প্রদায়কে ছোট করা নয়, কারও ঐতিহাসিক পরিচয় অস্বীকার করা নয়; বরং সবাইকে মনে করিয়ে দেওয়া—মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার জন্মে নয়, তার চরিত্রে; তার উপাধিতে নয়, তার আমলে; তার বংশে নয়, তার মানবিকতায়।আমরা যদি আজও এই সামাজিক কুসংস্কার দূর করতে ব্যর্থ হই, তাহলে আগামী প্রজন্ম আমাদের ক্ষমা করবে না। তারা প্রশ্ন করবে—যে ধর্ম বিলাল (রা.), সালমান আল-ফারসি (রা.) ও সুহাইব রূমী (রা.)-কে একই কাতারে দাঁড় করিয়েছিল, সেই ধর্মের অনুসারীরা কেন নিজেদের মধ্যে কৃত্রিম বিভাজন সৃষ্টি করেছিল?আসুন, আমরা শপথ নিই—বরাক উপত্যকার প্রতিটি মহল্লা, প্রতিটি মসজিদ, প্রতিটি ওয়াজ মাহফিল এবং প্রতিটি সামাজিক মঞ্চে ইসলামের সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিক মর্যাদার বাণী পৌঁছে দেব। বিভেদের দেয়াল নয়, ঐক্যের সেতু নির্মাণ করব। অহংকারের নয়, তাকওয়ার প্রতিযোগিতায় অংশ নেব। কারণ সমাজকে বদলানোর সর্বশ্রেষ্ঠ শক্তি ঘৃণা নয়, জ্ঞান; বিদ্বেষ নয়, প্রজ্ঞা; বিভাজন নয়, ভালোবাসা।শেষে একটি কথা—"নহে আশরাফ শুধু যার আছে বংশের পরিচয়,সেই আশরাফ, যার জীবন পুণ্যকর্মময়।"এই চেতনা যদি আমাদের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত হয়, তবে কোনো তথাকথিত জাতিভেদই আর সমাজকে বিভক্ত করতে পারবে না। ইসলামের প্রকৃত শিক্ষা, মানবতার প্রকৃত সৌন্দর্য এবং ভ্রাতৃত্বের প্রকৃত আদর্শ তখনই আমাদের সমাজে বাস্তব রূপ লাভ করবে।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment